আমরা সবাই সবই পারি, তবে ...

লেখক- ফারুক আহাম্মেদ

----------------------------------------------
আবার করোনার থাবা,আবার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ । প্রায় ১৫ মাস বা কমবেশি ৪৫৬ দিন যাবত সকল ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বন্ধ চলছে। এই মুহূর্তে হলফ করে কেউ বলতে পারবে না আগামী জুলাই মাসে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় খুলবে কি খুলবে না। সে যাই হউক , স্কুল-কলেজ হয়ত ইনশাআল্লাহ একদিন না একদিন খুলবেই, কিন্তু ইতোমধ্যে শিক্ষার যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে তা পূরণ করা আর সাঁতার কেটে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দে'য়া একই অবস্থা ।
অথচ আগে আমরা কি দেখতাম । হরতালে, প্রাকৃতিক দুর্যোগে বা লম্বা কোন ছুটি বা অন্য কোন কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিছু দিন বন্ধ থাকলে পিতা মাতার চোখে মুখে রাজ্যের চিন্তা দেখা যেতো। "হায় ! আল্লাহ্, আমার বাচ্চার কি হবে" আবার প্রতিষ্ঠান প্রধানের কাছে অনুষ্ঠান বা পিকনিকের জন্য দু'এক দিন বাড়তি ছুটির আবদার করলে, উনারা অপারগতা বা অসহায়ত্ব প্রকাশ করতেন আর বলতেন "ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াশোনা ব্যাঘাত ঘটবে "। কর্তৃপক্ষের কাছে রমজান মাসে ছুটির দরখাস্ত জানালে শুনা যেত, " শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়বে" এই যুক্তিতে আবেদন নাকচ বা নামঞ্জুর করা হতো । বাচ্চাদের একটা ক্লাস বা পরীক্ষা মিস হবে এই ভয়ে সব ধরনের বেড়ান-খেলান, স্বাদ-আহ্লাদ উৎসব পার্বণ থেকে বাবা-মায়েরা কঠোর ও কঠিন ভাবে নিজেদেরকে বিরত রাখতেন । কেহ বাসায় আসার আহ্বান করলে বা দাওয়াত দিলে শুনা যেত " এখন না ভাবী, বাচ্চার স্কুল, কোচিং সবই খোলা।পরীক্ষা শেষ হলে অবশ্যই আসব, কিছু মনে করবেন না ভাবী " ।শুধু মাত্র বাচ্চার পড়া-লেখা ক্ষতি হবে এই চিন্তায় সামাজিকতা , আতিথেয়তা, ভদ্রতা, আন্তরিকতা সহ বহু কিছু থেকে বাবা- মায়েরা নিজেদের মুখ ফিরিয়ে রাখতেন । পড়া-শোনার ব্যাপারে বিশেষ করে মায়েরা একদম 'জিরো টলারেন্স' নীতি অনুসরণ করতেন । কে কি মনে করলো বা কে কি ভাবলো সেটা কিন্তু তাঁরা থোড়াই কেয়ার করতেন ।
আসলে মানুষ সময়ে সবই পারে, তবে গ্যারাকলে পড়লে । করোনা যেমন বহু মূল্যবান জীবন কেড়ে নিয়েছে, তেমনি কিছু শিক্ষা ও দিয়েছে । যেমন: বিপদে পড়লে নিজের মানসিক অবস্থা কেমন হয়, আশপাশের পাড়া-পড়শি, আত্মীয়-স্বজন, জ্ঞাতি-গোষ্ঠী, বন্ধু-বান্ধব কেমন আচরণ করেন আর কিভাবে এ থেকে ঘুরে দাঁড়াতে হয় । দ্বিতীয়ত: আমাদের ধৈর্য্য ধারণ শিখতে হবে । সব পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধারণ করতে হবে । কোন কিছুতেই অস্থির বা অধৈর্য হলে কোন ফল পাওয়া যাবে না ।"সবুরে মেওয়া ফলে" এই প্রবাদ আমরা সবাই জানি কিন্তু মানি ক'জন ধৈর্যের প্রসঙ্গে একজন বিখ্যাত ইংরেজ কবি জন মিল্টন বলেন "Patience is the key to paradise. One should not lose one's patience in the midst of danger and disaster. Waiting for God is as good as serving for God. আর এ প্রসঙ্গে শেক্সপিয়ার বলেন " How poor and unfortunate are they who have no patience ,tolerance, endurance and forbearance! " পবিত্র কোরআন এ সূরা বাক্বারাহ্ এ ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ও সুস্পষ্ট উল্লেখ আছে " ইন্নাল্লা-হা মা'আছ্ ছা-বিরীন্।" নিশ্চয় আল্লাহ্ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন । অতএব আল্লাহর উপর বিশ্বাস, ভরসা ও আস্থা রেখে বকের মাছ শিকারের ন্যায় ধৈর্য ধারণ করতে হবে ।
তবে এটা স্বীকার করতেই হবে যে বাচ্চাদের পড়াশোনায় মনোযোগ বা সংযোগ আশংকা জনক ভাবে হ্রাস পেয়েছে । পড়া-শোনার যে আদি ও পুরোনো প্রতিষ্ঠিত রুটিন যেটা পূর্ব-পুরুষ থেকে করোনা পূর্ব পর্যন্ত অনুসরণ ও অনুশীলন হয়ে আসছিল সেটা একেবারেই লণ্ডভণ্ড ।এখন অনেক বাচ্চারাই সকাল, বিকাল ও সন্ধ্যায় রুটিন মেনে বই নিয়ে বসতে চায় না । আর বসবেইবা কিভাবে ।হাতের কাছে যখন মোবাইল, টেব, টেলিভিশন, ডেস্কটপ বা ল্যাপটপের মত ডিভাইসের ছড়াছড়ি , তখন বই আর বাচ্চাদের আকৃষ্ট করতে পারে না । বরং তাঁরা বিদেশি দের আবিষ্কৃত মরন নেশার মতো কিছু গেম যেমন: PUBG ,Free fire , COC , COD , Valorant, Csgo, Apex lengendsতে বেশি আকৃষ্ট হয় । সরকার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অবশ্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে শিক্ষার্থীদের পড়ার টেবিলে আনার চেষ্টা করছেন। এজন্য অনলাইন প্লাটফর্মে ফেইসবুক লাইভ ক্লাস নিয়ে সংসদ টিভি, বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে ক্লাস ও অ্যাসাইনমেন্ট ভিত্তিক পরীক্ষা নিয়ে চেষ্টা করা হচ্ছে । প্রথম দিকে বেশ আকৃষ্ট হলে ও এখন কিন্তু আর এই মাধ্যম গুলির প্রতি বাচ্চারা তেমন আগ্রহ বা উৎসাহ দেখায় না ।
এ অবস্থায় বসে থাকলে চলবে না । কিছু একটা করতে হবে । এই প্রজন্ম কে রক্ষা করতে হবে ।কারণ এরাই আগামী দিনের নেতা, ভবিষ্যত বাংলাদেশের নেতৃত্ব এদের হাতেই থাকবে । তাই এদের গঠনে আর গড়নে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও আন্তরিক মনোযোগ দিতে হবে ।
তাছাড়া বাবা মায়ের আকুতি ও দীর্ঘশ্বাস; বাসায় থেকে থেকে বাচ্চারা কেউ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে , কেউ আবার অধিক ওজন নিয়ে মুটিয়ে যাচ্ছে ।কেউ আবার পড়াশোনা ছেড়েই দিয়েছে । বাচ্চারা একই পদ্ধতিতে বেশি দিন থাকতে চায়না ।সব সময় নতুন কিছুর অপেক্ষায় থাকে ।তাই বাচ্চাদের কে ঝিমানি অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য এবং ভাঙ্গা মন চাঙ্গা করার জন্য কিছু নতুন পদক্ষেপ নে'য়া যেতে পারে।যেমন: ভ্রাম্যমান লাইব্রেরির আদলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে মহল্লা ভিত্তিক " ভ্রাম্যমান ক্লাস " ও ভ্রাম্যমান পরীক্ষা নে'য়া যেতে পারে । টিভি চ্যানেলে টকশো এর পরিবর্তে স্টাডি শো করা যেতে পারে। স্কুল ভিত্তিক শিক্ষার্থীদে অনলাইনে আমন্ত্রণ জানিয়ে একাডেমিক শো করা যেতে পারে ।
কিছু মারাত্মক গেম নিয়ন্ত্রণ করতে হবে ।( চলবে...)

Post a Comment

Previous Post Next Post